বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক:

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক:

বাংলাদেশের জন্মের সময় বাংলাদেশকে যারা গলা টিপে মেরে ফেলতে চেয়েছিল চীন তাদের মাঝে অন্যতম। কিন্তু আধুনিক যুগের নিয়ম হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে নিজেকে বদলে নেওয়া। আর চীন সেই নীতিতেই অগ্রসর হচ্ছে।

♦প্রাচীন বাংলার সাথে চীনের সম্পর্ক:

চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কয়েকদিনের বা কয়েকযুগের নয়। এই সম্পর্ক শতাব্দীকাল ধরে চলে আসছে। চীনে বাংলাদেশের মানুষের যাতায়াত হাজার বছর পুর্বেও ছিল। আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর পুর্বে অতীশ দীপঙ্কর চীন সফর করেছিলেন। চীনের মানুষের সাথে বাংলার সংস্কৃতির পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। অতীশ দীপঙ্কর ১০৫৪ সালে তিব্বতে মারা যান। চীন ১৯৭৮ সালে তার দেহভষ্ম ফিরিয়ে দেয় বাংলাদেশকে। এছাড়া চীনের অনেক পর্যটক ভারতবর্ষ তথা বাংলা সফর করেছেন। তাই চীনের সাথে বাংলার সম্পর্ক আধুনিক যুগের সৃষ্টি নয়, এ সম্পর্ক হাজার বছরের পুরানো। চীনের সাথে প্রাচীন বাংলার সম্পর্ক কেমন ছিল তা অন্য কোন দিন আলোচনা করা যাবে। আপাতত দেখা যাক বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীন কতখানি জায়গা জুড়ে অবস্থান করছে।

♦বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের অবস্থান:

চীন বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধে বাংলাদেশের বিপক্ষে অবস্থান করেছে। এর পেছনে কারন রয়েছে। বলা হয়ে থাকে শত্রুর শত্রু বন্ধু হয়।

১৯৬২ সালে চীন ভারত সম্পর্কের রক্তঝরা স্মৃতি তখনো বিস্মৃত হয়নি চীনের। মাত্র ৯ বছরের ব্যবধানে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে ভারত পাকিস্তানের সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চীনের পুরাতন শত্রু ভারতের সমর্থন চীন ভালোভাবে দেখেনি। তাই চীন আপন স্বার্থেই এই যুদ্ধে পাকিস্তানকে সমর্থন করে।

তবে চীনের সেই বিরোধিতা কাজে আসেনি।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলে চীন বাংলাদেশকে সহজে মেনে নেয়নি। স্বাধীন হবার পরপরেই বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে চেয়েছিল। কিন্তু এতে চীন ভেটো প্রদান করায় বাংলাদেশের সদস্যপদ পেতে বিলম্ব হয়।

বাংলাদেশ ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সদস্য হয়। কিন্তু তখনো চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়নি। চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে ১৯৭৫ সালের ৩১ আগস্ট।বলাই যায় যে চীনের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা যাচ্ছেতাই ছিল। তবে বরফ গলতে সময় লাগেনি। দ্রুতই চীন বাংলাদেশ সম্পর্ক ইউ টার্ন নেয়।

♦চীনের সাথে সম্পর্ক বাণিজ্যিক নাকি রাজনৈতিক?

একটা বিষয়ে চীনের অবস্থান খুবই পরিষ্কার যে বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ব্যাপারে কোন প্রকার লালসা চীনের নেই। বেইজিং কেবলই বাণিজ্যিক সুবিধার্থে ঢাকাকে ব্যবহার করেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে নয়াদিল্লী যেমন সব সময় নাক গলায় বেইজিং তেমনটি করেনা। বেইজিং কেবল অর্থনৈতিক উদ্দেশ্যে কাজ করে যাচ্ছে।

♦চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে বাংলাদেশ:

বাংলাদেশ চীনের ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড প্রকল্পে স্বাক্ষরকারী একটি দেশ। বাংলাদেশ চীনের এই প্রকল্পটিতে স্বাক্ষর করে ২০১৬ সালে। এর ফলে চীনের নিউ সিল্ক রুটের আওয়াভুক্ত হবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ চীনের এই প্রকল্পের অতি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

কারন নিউ সিল্ক রুটের মাধ্যমে চীন প্রায় ৬৫ টি দেশকে একই সুত্রে বেধে ফেলতে চাইছে। চীনের নিউ সিল্ক রুটের সফল বাস্তবায়নের জন্য বঙ্গোপসাগরে একটি ঘাটি তাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

♦পায়রা সমুদ্রবন্দরে চীনা বিনিয়োগ :

চীন বঙ্গোপসাগরে গভীর বন্দর নির্মাণ করতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। যদি পায়রা বন্দরটি সফলভাবে চালু হয় তবে চীন তাদের পণ্য কুনমিং বন্দর থেকে সহজেই পায়রার মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করাতে পারে। এতে চীন একটি কৌশলগত সুবিধা ভোগ করবে।

ভারত মহাসাগর হয়ে বর্তমানে মুম্বাই এবং অন্যান্য ভারতীয় শহরে চীনা পন্য যেতে প্রায় ১৪/১৫ দিনের সমুদ্রযাত্রার প্রয়োজন হয়। কিন্তু ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী সেই পন্য ভারতে ৬/৭ দিনেই পৌছে যেতে পারে। এর জন্য চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ-ভারত এই করিডোর উন্মুক্ত করা দরকার। তবে ভারত এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য কখনোই চীনের এই মহাপরিকল্পনার অংশ হতে যাবে না।

উপরন্তু বাংলাদেশের পায়রা বন্দরে চীনা বিনিয়োগের ব্যাপারে নয়াদিল্লী ঢাকাকে এক ধরণের হুশিয়ারি দিয়েছে বলা যায়। তাই চীন বাংলাদেশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রাচীর হয়ে দাঁড়াবে ভারত।

♦প্রশ্ন হচ্ছে পায়রা বন্দর নির্মান হলে আর এতে চীনা বিনিয়োগ হলে বাংলাদেশের লাভক্ষতির খতিয়ান কি হবে?

এখানে একটি বিষয়ে স্পষ্ট ধারনা থাকা উচিৎ যে বাংলাদেশ বন্দরের সত্ত্ব কাউকে দিয়ে দিচ্ছে না। বরং বাংলাদেশ ব্যবসায়ের খাতিরে এতে চীনা বিনিয়োগের দ্বারস্থ হচ্ছে। কাজেই যেদিক থেকেই বিনিয়োগ আসেনা কেন বাংলাদেশের উচিৎ হবে সর্বপ্রথম তা লুফে নেওয়া। কারন এই বন্দরের কাজ সম্পুর্ন হলে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের উপর চাপ কমবে।

একই সাথে নতুন বন্দরটি গভীর হওয়ার কারনে বাংলাদেশে বিদেশী জাহাজ ভিড়াতে অসুবিধা হবেনা। বিনিয়োগ যেদিক থেকেই আসুক আমাদেরকে স্বাগত জানাতে হবে। তবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যে বিনিয়োগের শর্ত যেন একচেটিয়া না হয়। কারন বুদ্ধিমান সেই হয় যে নিজের বাড়ির উঠানে ভীনদেশীদের আধিপত্য স্বীকার করেনা। তাই আমাদের পায়রা বন্দরের প্রবেশদ্বার উন্মুক্ত করার আগে সেখানে প্রহরী রাখার ব্যাবস্থা করতে হবে।

♦দক্ষিণ চীন সাগরের সাথে বঙ্গোপসাগরের সম্পর্ক:

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দক্ষিণ চীন সাগরের সাথে বঙ্গোপসাগরের সম্পর্ক খুবই তাৎপর্যপুর্ন। এর কারন হচ্ছে চীনের সাথে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য।

♦ বাংলাদেশ তার প্রয়োজনে যা কিছু আমদানি করে তার সিংহভাগ চীন থেকেই আসে। অন্য দিকে চীন যা কিছু আমদানি করে তার শতকরা এক ভাগ বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে থাকে। তাই দুই দেশের বিদ্যমান এই ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি দূরীকরণে এই বাণিজ্যপথ সুসংহত করা জরুরি। বাংলাদেশের পায়রা বন্দর যদি পুরোপুরিভাবে চালু হয় তাহলে চীনের কুনমিং বন্দর সহ বেশ কয়েকটি বন্দরের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক তৎপরতা বৃদ্ধি পাবে। এতে করে আমদানি কিংবা রপ্তানি বাণিজ্য উভয় ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ সফল হবে।

♦চীন -বাংলাদেশ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর :

                           ২০১৬ সালে চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং বাংলাদেশ সফরে আসলে  চীন এবং বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ২৭ টি চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। এটা চীনের সাথে বাংলাদেশের একটি দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক স্থাপনে ভূমিকা পালন করবে। চীনের সাথে এই চুক্তিগুলো স্থাপন করার ফলে চুক্তিগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে দুশ্চিন্তা কিছুটা কমে গেছে। কারন ২০১৮ সালের মার্চে চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিন পিং আজীবন প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকার প্রক্রিয়া সম্পুর্ণ করেছেন।

তাই বলাই যায় চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চীনের পক্ষ থেকে কোন প্রকার বাধা আসবে না। যদি বাংলাদেশ এই চুক্তিগুলো থেকে কোন কারনে সড়ে না দাঁড়ায় তবে এই চুক্তিগুলো বাস্তবায়নের পথে কোন বাধা নেই।

♦চীনের বিনিয়োগ :

কেবল ২০১৬ সালেই চীন বাংলাদেশে প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। আর অবকাঠামোগত খাতেই চীন এই বিনিয়োগ বেশি করেছে। তাই বলাই যায় বাংলাদেশের সাথে চীন দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে আবদ্ধ হতে চলেছে। চীন বাংলাদেশের সড়কপথ, অর্থনীতিক অঞ্চল, বন্দর ব্যসস্থাপনা এসব খাতে কাড়ি কাড়ি অর্থ বিনিয়োগ করছে।

চীনের ওয়ান রোড ওয়ান বেল্ট প্রকল্পটি প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প। আর এই মেগা-প্রজেক্টের আয়তায় চীন প্রায় ৬৫ টি দেশে ছোট বড় ৯০০ টিরও অধিক প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে। তাই বলাই যায় চীন বাংলাদেশের প্রতি অধিক আকৃষ্ট। চীন তার বিনিয়োগের প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ডলার পাকিস্থানে দিচ্ছে। কৌশলগত সুবিধার প্রয়োজনে এবং বাজার দখলের জন্য চীন পাকিস্তানে এই বিনিয়োগ করেছে।

♦সাবমেরিন ক্রয়:

বাংলাদেশ প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বিনিময়ে চীন থেকে দুটি সাবমেরিন ক্রয় করেছে। সাবমেরিন দুটি চীন ২০১৭ সালে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করেছে। বাংলাদেশের নৌবহরে এই দুটি সাবমেরিন যুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের নৌবাহিনী একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে পরিণত হয়েছে।

বানৌজা নবযাত্রা এবং বানৌজা জলযাত্রা নামের এই দুটি সাবমেরিন বাংলাদেশের জলসীমা সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করবে। চীনের কাছ থেকে আরো দুটি সাবমেরিন কেনার ব্যাপারে বাংলাদেশের কথা হয়েছে। শীঘ্রই সাবমেরিন দুটি বাংলাদেশের নৌবহরে যুক্ত হবে। অনেকেই এই সাবমেরিন কেনার সমালোচনা করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের জলসীমায় নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিতে সাবম

top
© Super30 Bangladesh. All rights reserved.
X